logo Menu
বাংলা ইতিহাস ভূগোল সাধারণ জ্ঞান গণিত ভৌত বিজ্ঞান জীবন বিজ্ঞান ইংরেজি ভারতের সংবিধান অর্থনীতি শিশু মনস্তত্ত্ব পরিবেশ কম্পিউটার
     ❯   

পরিবেশ বিদ্যা চর্চা

পরিবেশবিদ্যা

পরিবেশবিদ্যার বহুমুখী প্রকৃতি

ভূমিকা পরিবেশ পরিবেশের উপাদান পরিবেশবিদ্যা পরিবেশবিদ্যার পরিধি পরিবেশগত শিক্ষার গুরুত্ব স্থিতিশীল উন্নয়ন

বিশ্ব: বাস্তুসংস্থান ও বাস্তুতন্ত্র

ভূমিকা বাস্তুতন্ত্রের উপাদান সমূহ খাদ্যশৃঙ্খল খাদ্য জাল বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ বাস্তুতন্ত্রের ধারণা বাস্তুতান্ত্রিক উত্তরাধিকার পুকুরের বাস্তুতন্ত্র সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র তৃণভূমির বাস্তুতন্ত্র বনভূমির বাস্তুতন্ত্র মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র মোহনা অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র নদীনালার বাস্তুতন্ত্র হ্রদের বাস্তুতন্ত্র জীবমণ্ডল

প্রাকৃতিক সম্পদ

ভূমিকা সম্পদ সম্পদের শ্রেণিবিভাগ প্রাকৃতিক সম্পদ নবীকরণযোগ্য সম্পদ অনবীকরণযোগ্য সম্পদ ভূমিসম্পদ অরণ্যসম্পদ জলসম্পদ শক্তিসম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ স্থিতিশীল উন্নয়নে সম্পদ

জীববৈচিত্র্য ও তার সংরক্ষণ

ভূমিকা জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা জীববৈচিত্র্যের স্তর জীববৈচিত্র্যের মূল্য জীববৈচিত্র্যের দেশ ভারতবর্ষ জীববৈচিত্র্যের উষ্ণ অঞ্চল জীববৈচিত্র্যের সঙ্কট বিরল , বিপন্ন ও বিলুপ্ত প্রাণী জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ যৌথ বন ব্যবস্থাপনা

পরিবেশ দূষণ

ভূমিকা পরিবেশ দূষণ জল দূষণ বায়ু দূষণ মৃত্তিকাদূষণ শব্দদূষণ

জনসংখ্যা ও পরিবেশ

ভূমিকা বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যার তারতম্য জনবিস্ফোরণ পরিবার পরিকল্পনা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য পুনর্বাসন ও পুনস্থাপনের সমস্যা পরিবেশের বিপর্যয় বন্যা ভূমিকম্প সাইক্লোন ভূমিধস ধস ব্যবস্থাপনা বায়ুদূষণ : ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা চের্নোবিল দুর্ঘটনা বিশনই আন্দোলন আপ্পিকো চাভেলী আন্দোলন চিপকো আন্দোলন সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন পরিবেশ নৈতিকতা পরিবেশ রক্ষায় সংস্কৃতি লিঙ্গ মানবাধিকার পরিবেশ সচেতনতা

পরিবেশ ব্যবস্থাপনা

পরিবেশ ব্যবস্থাপনা জমি সংরক্ষণ অরণ্য সংরক্ষণ খনিজ সম্পদ সংরক্ষণ সম্পদের পুনঃব্যবহার দূষণ নিয়ন্ত্রণ কৌশল পরিবেশ বিষয়ক নীতি

পরিবেশগত আইন

পরিবেশ সংক্রান্ত আইন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৮৬ বায়ুদূষণ আইন ১৯৮১ জলদূষণ আইন ১৯৭৪ জল(দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ) কর আইন , ১৯৭৭ শব্দদূষণ আইন ২০০০ ভূমিদূষণ আইন ১৯৮৯ অরণ্য সংরক্ষণ আইন ১৯৮০ বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ১৯৭২ কেন্দ্র দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ আন্তর্জাতিক মান নির্ধারক সংস্থা জীববৈচিত্র্য আইন ২০০২ আন্তর্জাতিক চুক্তি জীববৈচিত্র্যের সম্মেলন সংরক্ষিত এলাকা আদিবাসী জনসংখ্যা ও তার আধিকার মানুষ ও বন্যপশু সংঘাত

জলদূষক


3.1.2 বিভিন্ন প্রকার জলদূষক ও তার প্রকারভেদ (Types of Water Pollutant and Their Effects): বিভিন্ন প্রকার জলদূষক বা দূষণকারী পদার্থ (pollutant) আছে। 1. জৈবিক দূষক (Biological Pollutant) : (a) রোগবাহক (Pathogens) : জলের জীবাণুঘটিত দূষণের উৎসগুলিকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা—প্রাকৃতিক উৎস ও মানবীয় কার্যকলাপ। জল দূষণের জন্য দায়ী জীবাণুগুলিকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়- (1) ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) : গৃহস্থালির বর্জ্য পদার্থ থেকে ব্যাকটেরিয়াজনিত জলদূষণ ঘটে। কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী হলেও অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জলদূষণের মাধ্যমে কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, উদরাময় প্রভৃতি রোগ সৃষ্টি করে। (2) ভাইরাস (Viruses) : এইগুলি দূষিত ও বর্জ্য জলে অবস্থান করে। ভাইরাসঘটিত রোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হেপাটাইটিস, Poliomyelitis, Enteroviral infections প্রভৃতি। (3) কৃমি (Worm) : অপরিশোধিত আবর্জনা ও নোংরাস্থিত নিমাটোড ও ফিতাক্রিমি উন্মুক্ত কূপ, পুকুর ও জলাধারে মিশে জলকে দূষিত করে। ফলে এই জল থেকে Hook worm, Guinea worm দ্বারা infection হয়, অ্যামরিয়াসিস ইত্যাদি রোগের সৃষ্টি হয়। (4) শ্যাওলা (Algae) : শ্যাওলা ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের জলে স্বাভাবিকভাবেই অবস্থান করে। তাই একে জলের গৌণ দূষক বলা হয়। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে CO2 গ্রহণ করে এবং বায়ুতে O2 মুক্ত করে। ইহা জলের প্রাকৃতিক শোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু অধিক পরিমাণে শ্যাওলার উপস্থিতি জলের গন্ধ, স্বাদ, বর্ণ ও স্বচ্ছতার বিরূপ পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু শ্যাওলা অত্যন্ত বিষাক্ত, মৃত শ্যাওলার স্তর জলের মধ্যে অক্সিজেন প্রবেশে বাধা দেয়, মাছের দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং উদরাময় রোগে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। (b) অক্সিজেন হ্রাসকারী পদার্থসমূহ (Oxygen Demanding Substances) : বিভিন্ন জৈব পদার্থ জলে অবস্থান করে। যেসকল জৈব পদার্থ জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের সাহায্যে জীবাণু দ্বারা বিয়োজিত হয় সেই সকল জৈব পদার্থকে জীবাণু দ্বারা বিয়োজিত অক্সিজেন হ্রাসকারী পদার্থ (Bio-degradable Oxygen Demanding Substance) বলে। যেমন—স্টার্চ, প্রোটিন, জৈব অ্যাসিড ইত্যাদি গৃহস্থালি ও কলকারখানার বর্জ্য পদার্থের জলে মেশার জন্য এইসকল জীবাণুর উৎপত্তি। অক্সিজেনের সাহায্যে বিয়োজন ঘটে বলে জলে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। ফলে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বৃদ্ধি হ্রাস পায় এবং একসময়ে মৃত্যু হয়। 2. রাসায়নিক দূষক (Chemical Pollutants) : (a) আগাছা পুষ্টকারী পদার্থের উপস্থিতি (Nutrients) : বৃষ্টির জলে মাটির পুষ্টিকর পদার্থগুলি; যেমন—নাইট্রোজেন, ফসফেট ইত্যাদি ধুয়ে জলাশয়ের জলে মেশে এবং জলজ উদ্ভিদের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া: জলাশয় ক্রমশ মজে যায়। এই ঘটনাকে ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) বলে। ইউট্রোফিকেশনের ফলে জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকে। ফলে জলজ প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস পায়। অক্সিজেনের অভাবে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটে এবং দেহাবশেষের পচনের ফলে জলাশয়ের জল কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, গৃহস্থালি ও পানের পক্ষে অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। নাইট্রোজেন (Nitrogen) : প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড ইত্যাদি থেকে নাইট্রোজেন জলে সংযুক্ত হয়। প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড ইত্যাদির জৈবিক বিয়োজন ঘটে এবং NO3-, NO2- ও NH3 উৎপন্ন হয়। অধিক পরিমাণে ইহাদের উপস্থিতিতে জল অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এইগুলি জলদূষক হিসাবে গ্রাহ্য হয়। এদের উপস্থিতিতে জল পরিশোধনের সময় ক্লোরোমিন উৎপন্ন হয় যা ব্যাকটেরিয়া নিধনের জন্য তুলনামূলকভাবে মুক্ত ক্লোরিনের থেকে কম সক্রিয়। অধিক পরিমাণে জলে নাইট্রাইট (NO2-) উপস্থিত থাকলে, নাইট্রাইট লবণ-অ্যামিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রোসোমাইন উৎপন্ন করে যা ক্যানসার রোগের কারণ হয়। যদি NO3- অধিক পরিমাণে জলে উপস্থিত থাকে তাহলে NO3- ব্যাকটেরিয়া দ্বারা বিজারিত হয়ে NO2 এ পরিণত হয়। উৎপন্ন NO2 রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে শিশুদেহে Methomoglobanimia গঠন করে যা Blue Baby Disease নামে খ্যাত। হিমোগ্লোবিন ও NO2 এর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন জটিল যৌগ রক্তের অক্সিজেন বহনক্ষমতা হ্রাস করে। ফলে শিশু অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। (b) দ্রবীভূত বিভিন্ন লবণ ও কাদা (Dissolved Salts & Clay) : নানারকম লবণ ও কাদা, জলের মধ্যে দ্রবীভূত ও অদানাদার (colloidal) অবস্থায় অবস্থান করে। ভূপৃষ্ঠস্থিত জল (Surface Water) অপেক্ষা ভৌমজল (Ground Water)-এ লবণের মাত্রা অধিক হয়। নানারকম প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় জলে মাটি ও লবণের আধিক্য হয় এবং জল দূষিত হয়। Ca, Mg ও Fe-এর ক্লোরাইড, সালফেট ও বাইকার্বনেট লবণের উপস্থিতিতে জল খর হয়। খর জল ব্যবহারে সাবান খরচ বেশি হয়, খাদ্যদ্রব্য সুসিদ্ধ হয় না, বয়লারের গায়ে আঁশ সৃষ্টি হয়, বয়লার ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যদি Na লবণের পরিমাণ বেশি হয় জল অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। হার্ট ও কিডনির রোগীদের ক্ষেত্রে জীবনহানির কারণ হয়। এ ছাড়া, ভৌমজলে (Ground Water) Fe, Mn-এর লবণ, উদ্বায়ী জৈব যৌগ ও লবণের মাত্রা অধিক থাকে। ফলে, Fe2t মুক্ত বায়ুতে Fe3t এ পরিণত হয়ে জৈব অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ও অধঃক্ষেপ সৃষ্টি হয়। Fe, Mn-এর লবণের জন্য জলে রঙের সমস্যা দেখা দেয়। নানারকম সার কারখানা, ঔষধ কারখানা, অ্যালুমিনিয়াম কারখানা থেকে জলে F- (ফ্লোরাইড) লবণের আধিক্য দেখা যায়। জলে ফ্লোরাইডের গাঢ়ত্ব বেশি হলে হাত ও দাঁতের বিকৃতি ঘটতে পারে। (c) ভারী ধাতু ও কীটনাশক পদার্থসমূহ (Heavy metals & Pesticides) : আর্সেনিক ও সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, দস্তার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতিতে জল ভীষণভাবে দূষিত হয়। ধাতুগুলি জলের পুঞ্জীভূত বিষ। সিসা (Pb) : রং শিল্পে, ক্ষতিকারক রাসায়নিক বহন করার পাইপ তৈরিতে, ধাতব যৌগ হিসাবে, ভৌম জল বা ground water-এর মধ্যে বৈদ্যুতিক কেবল-এর ঢাকনা তৈরিতে এবং স্টোরেজ ব্যাটারি প্রস্তুতিতে ব্যাপকভাবে সিসা ব্যবহৃত হয়। মানুষের শরীরে সিসা খাদ্য, জল ও বাতাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে। মানুষ সিসার বিষে আক্রান্ত হলে রক্তাল্পতা (Anemia) দেখা দেয় কারণ সিসা শরীরের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফলে লোহিত কণিকা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। জলে মুক্ত আয়ন (Pb2t) বা বিভিন্ন জৈব ও অজৈব যৌগ হিসাবে দ্রবীভূত বা অদানাদার (কলয়ডীয়) অবস্থায় থাকতে পারে। জলে দ্রবীভূত সিসার জন্য মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ ; যেমন—পেটব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, কোষ্ঠকাঠিন্য, মানসিক বিষাদ, স্নায়ুর গোলযোগ, কিডনির অসুখ প্রভৃতি দেখা দেয়। পারদ (Hg) : ইহা মৌল বা বিভিন্ন যৌগ অবস্থায় জলে দ্রবীভূত থাকতে পারে এবং ইহার বিষক্রিয়া দ্বারা মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন করে ও পক্ষাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। লেক বা নদীর জলে পারদ-এর পরিমাণ অত্যধিক থাকে। মাছের শরীরে, বিশেষ করে ছোটো মাছের টিস্যুতে পারদ CH3Hg+ হিসাবে অবস্থান করে এবং অক্সিজেন ব্যতিরেকী (anaerobic) ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা উদ্বায়ী (CH3)2Hg তে পরিণত হয়। মানুষের শরীরে পারদ খাদ্যশৃঙ্খল (food chain)-এর মাধ্যমে প্রবেশ করে। মার্কারি বা পারদ ধাতু, জৈব যৌগ এবং অজৈব যৌগ হিসাবে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। ফলে জলের সংস্পর্শে এসে জলকে বিষাক্ত করে। আর্সেনিক (As) : ভৌমজল দূষণের একটি অন্যতম কারণ হল আর্সেনিকের বিষক্রিয়া। চাষের কাজে ভূগর্ভস্থ জলের দ্রুত ও ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মাটির পলিস্তর থেকে আর্সেনিক নির্গত হয়ে ভৌমজলকে দূষিত করে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের আটটি জেলাসহ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল–চিলি, আর্জেন্টিনা, উত্তর মেক্সিকো এবং তাইওয়ানে আর্সেনিকযুক্ত পানীয় জল ব্যবহারের ফলে লক্ষাধিক মানুষ আর্সেনিকোসিস মেক্সিকোর। এই নামক রোগে আক্রান্ত হয়। ইহা সাধারণত মিথাইল আর্সেনিক যৌগ ; যেমন—(CH3)2As (ট্রাই-মিথাইল আর্সেনিক), (CH3)2AsH (ডাই-মিথাইল আর্সেনিক অ্যাসিড), CH3AsH2 (মিথাইল আর্সেনিক অ্যাসিড) ইত্যাদি আকারে জলে উপস্থিত থাকে। সমুদ্রের জলে বেশি পরিমাণে বর্তমান থাকে। ইহা মানুষের চর্মরোগ, ক্যানসার, পক্ষাঘাত, চক্ষুপীড়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। ক্যাড্‌মিয়াম্ (Ca) : শিল্প কারখানার বর্জ্যপদার্থ থেকে জলে ক্যাডমিয়াম মিশে যায়। প্রধানত ইলেকট্রোপ্লেটিং কারখানা, দস্তা কারখানা থেকে ক্যাডমিয়াম্ জলে প্রবেশ করে। ইহার প্রভাবে মানুষ উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগ ও হাড়ের রোগে আক্রান্ত হয়, কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, রক্তের লোহিত কণিকা নষ্ট হয়। দস্তা (Zn) : বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে দস্তা (জিঙ্ক) জলে মিশে যায়। জলে উপস্থিত দস্তা মানুষের শরীরে পেটের অসুখ ও বমন ক্রিয়া (Vomitting) সৃষ্টি করে। কীটনাশক (Pesticides) : কীটনাশকগুলি প্রধানত জৈব পদার্থ। কিছু অজৈব পদার্থও আছে ; যেমন—CuSO4, 5H2O, NiCI2, AS2O3 ইত্যাদি। কীটনাশকের কাজ হল কীটপতঙ্গ, পঙ্গপালকে রোধ করা। (1) পতঙ্গনাশক (Insecticides ) : Organo phosphate Malathion. Organochlorines – DDT, Endrin. Organo Carbamate - Carboryl. (2) আগাছানাশক (Herbicides) : 2, 4 dichlorophenoxy acid. (3) ছত্রাকনাশক (Fungicides) : dithio carbamates. শস্যকে রক্ষা করার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এইগুলি জলে মিশে জল দূষিত করে। ফলে জলজ প্রাণী ; যেমন—মাছ প্রভৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদের বংশবৃদ্ধি লোপ পায়, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এইসকল মাছ খেয়ে মানুষ অসুস্থ হয়। 3. ভৌত দূষক (Physical Pollutants) : আধুনিক সভ্যতায় মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্রিয়াকলাপ ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের জল, এমনকি ভৌম জলকেও দূষিত করে তুলেছে। স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ, স্বচ্ছতা, উষ্ণতা, ঘনত্ব ইত্যাদি ভৌত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের ফলে বিশুদ্ধ জল যখন ব্যবহারযোগ্যতা হারায়, তখন তাকে জলের ভৌত দূষণ বলা হয়। নীচে ভৌত দূষণের প্রকৃতি আলোচনা করা হল। (1) বর্ণ (Colour) : বিভিন্ন শিল্পজাত বর্জ্য পদার্থ জলের সঙ্গে সংযুক্ত হলে জলের রং পরিবর্তিত হতে পারে। কলকারখানা থেকে নির্গত অজৈব, জৈব ও জৈব রঞ্জক পদার্থ জলের বর্ণের পরিবর্তন ঘটায়। তবে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করায় মানের সামান্য পরিবর্তন ছাড়া জলের এই বর্ণগত তারতম্য বিশেষ ক্ষতিকারক নয। (2) অস্বচ্ছতা (Turbidity) : মৃত্তিকার উপরিভাগ ধুয়ে আসা জলধারায় কলয়ডীয় পদার্থ ও সূক্ষ্ম ভাসমান কণা, তেল, গ্রিজ প্রভৃতির সংমিশ্রণে জল ঘোলাটে হয়ে পড়ে। ফলে জল দূষিত হয়। ঘোলা জল শিল্প ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা যার না কারণ এর সঙ্গে Fe, Mn, Ni, Co, Pb, Sb, Bi প্রভৃতি ক্ষতিকারক উপাদান মিশে থাকে। (3) স্বাদ (Test) : কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য জলে প্রচুর পরিমাণে Fe, Mn, Ni, মুক্ত ক্লোরিন, ফেনল প্রভৃতি দূষণকারী পদার্থ অবস্থান করে। এই সকল পদার্থ ভূপৃষ্ঠের জলের সঙ্গে সংযুক্ত হলে জলের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হয়। এ ছাড়া তেলের উপজাত দ্রব্য, তেল, হাইড্রোকার্বন, কীটনাশক ও বিয়োজিত জৈব পদার্থের অবস্থান জলকে বিশেষ স্বাদ দান করে ফলে জল স্বাভাবিকতা হারায় ও গ্রহণ-অযোগ্য হয়ে পড়ে। (4) গন্ধ (Odour) : জলে দুর্গন্ধের জন্য দায়ী উপাদানগুলি হল—হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, মুক্ত ক্লোরিন, ফেনল, অ্যালকোহল, হাইড্রোকার্বন প্রভৃতি। এ ছাড়া শ্যাওলা, ছত্রাক, অন্যান্য জীবাণু দ্বারা জলে দুর্গন্ধজনিত দূষণ ঘটে। ফলে জল ব্যবহারযোগ্যতা হারায়। (5) তাপ (Temperature) : তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য শিল্পে যন্ত্রপাতি ঠান্ডা করার কাজে নদী বা হ্রদের জল ব্যবহার করা হয়। এরপর ওই জল নদী বা হ্রদে নিক্ষেপ করলে জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। একে জলের তাপদূষণ বলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পায়। মাছ ও অন্যান্য জলজ জীব ও উদ্ভিদের জীবনচক্র ব্যাহত হয়, জলের ঘনত্ব হ্রাস পায়। ⚫ TDS, TSS, TS (Total Dissolved Solid, Total Suspended Solid, Total Solid) : জলের গুণমান নির্ণয়ের জন্য TDS, TSS, TS হল অত্যন্ত মূল্যবান মাপকাঠি। এ ছাড়া, জলদূষণ বা জলের গুণমান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে জলের অম্লতা, ক্ষারত্ব ও pH অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মাপকাঠি। এগুলি পরোক্ষভাবে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহে দূষণের গাঢ়ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। যদি জলের pH মান 7 থেকে কম হয় তাহলে বলা হয় জল আম্লিক অবস্থায় আছে ; যদি pH মান 7 থেকে বেশি হয় তাহলে বলা হয় জল ক্ষারীয় অবস্থায় আছে ; আবার যদি pH মান 7 এর সমান হয় তাহলে বলা হয় জল প্রশম অবস্থায় আছে। জলের গুণমান নিয়ন্ত্রণে pH হল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মাপকাঠি। অনেক রাসায়নিক ও জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া pH এর উপর নির্ভরশীল। জলের মৃদুকরণ পদ্ধতি ও ক্লোরিন দ্বারা জীবাণু মুক্তকরণ ইত্যাদি পদ্ধতি pH এর উপর নির্ভরশীল। 4. শারীরবৃত্তীয় দূষক (Physiological Pollutant) : নানারকম রাসায়নিক পদার্থ ; যেমন—CI2, SO2, H2S, Ketone, Phenol ইত্যাদির জলে উপস্থিতির জন্য জলের স্বাদ ঔষধের মতো হয় এবং দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। এই জল গ্রহণে মানুষের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। 5. তেজস্ক্রিয় দূষক (Radioactive Pollutant) : জলের উৎসের কাছে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র, পরমাণু শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ এবং হাসপাতালের বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদির জন্য জলে সাংঘাতিক তেজস্ক্রিয় দূষণ ঘটে। তেজস্ক্রিয় দূষকগুলি যথাক্রমে—Sr30, P32, P31, Pu239, Ra226, K40, Rb87, Th234 ইত্যাদি। তেজস্ক্রিয় মৌল দ্বারা দূষিত জল ব্যবহারে মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হয়। যে ব্যাধিতে মানুষ বংশপরম্পরায় আক্রান্ত হয়। শরীরের জীবিত কোষ নষ্ট হয়, ক্যানসারের মত দুরারোগ্য রোগে মানুষ আক্রান্ত হয়। ◼ পৌর বর্জ্য জল (Municipal Waste Water) : পৌর জলের বর্জ্যের বিশেষ বিশেষ উপাদানগুলি হল—ভাসমান সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কণা ও কলয়ডীয় পদার্থ, জৈব পদার্থের বিয়োজিত পদার্থ (biodegradable), এবং প্যাথোজেন বা রোগবাহক পদার্থ। ⚫ নিমজ্জিত অবস্থানে ভাসমান কঠিন পদার্থ (Suspended solid) : প্রাথমিকভাবে বলা যায় suspended solidগুলি জৈব পদার্থ। এদের বিয়োজনে জলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। এগুলি হল—জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহের বর্জ্য, কাগজ, খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারক শিল্পকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য (কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন, তেল, চর্বি) ইত্যাদি। ⚫ রোগবাহী জৈবসমূহ ( Pathogens) : প্যাথোজেন বলতে বোঝায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া, কৃমি ইত্যাদি। এই সকল পদার্থ জলে মানুষের দ্বারা মিশ্রিত হয় এবং জলে দূষণ ঘটায়। মানুষ এই জল ব্যবহার করলে নানারকম দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়। গৃহস্থালির বর্জ্য থেকে জলে প্যাথোজেনের আবির্ভাব।