বর্জ্য পৌরজল শোধন
3.1.3 পৌরজল শোধনের প্রক্রিয়াসমূহ (Treatment of Municipal Water) : ভূপৃষ্ঠে প্রবাহিত নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাশয়বাহিত জল (Surface Water) এবং ভূগর্ভস্থ জল (Ground Water) প্রাথমিক অবস্থায় পানযোগ্য থাকে না। পৌরসভা এই অপরিশোধিত জলকে শোধন করে সরবরাহ করে। মনে করি, নদীবাহিত অপরিশোধিত জলকে শোধন করা হবে। অপরিশোধিত জলকে প্রথমে পাম্পের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় শোধনকেন্দ্রে আনা হয় তারপর নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে শোধন করা হয়। 1. প্রাথমিক শোধন প্রক্রিয়া (Primary Treatment) : (1) তঞ্চন (Coagulation) : এই পদ্ধতিতে জলে ভাসমান সূক্ষ্মকণা, জৈব দূষক ও জীবাণু নষ্ট করা হয়। প্রথমে জলের সঙ্গে কিছু তত্ত্বক পদার্থ (Coagulant) ; যেমন—অ্যালুমিনিয়াম বা আয়রনের লবণ যুক্ত করা হয়। ফলে ভাসমান সূক্ষ্মকণাগুলি জমাট বেঁধে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় কার্বন গুঁড়ো, ক্লোরিন, ওজোন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ইত্যাদি মেশানো হয়। ইহাতে প্রাথমিকভাবে জলের জীবাণু নাশ হয় ও জৈব দূষকগুলির জারণ ঘটে। এরপর প্রয়োজন মতো pH মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যাসিড বা ক্ষার মেশানো হয়। (2) ফ্লক্কুলেশন (Flocculation) : এই পর্যায়ে জলকে টারবাইনের সাহায্যে ধীরে ধীরে নাড়ালে জমাট-বাঁধা সূক্ষ্ম কণাগুলি ভারী অধঃক্ষেপে পরিণত হয় যেগুলিকে ফ্লক্ (Floc) বলে। (3) থিতানো (Sedimentation) : প্রায় 20–30 মিনিট পর জলকে অধঃক্ষেপণ পাত্রে (Sedimentation Basin) ঢালা হয়। এখানে 2 থেকে 4 ঘণ্টা সময় লাগে ফ্লগুলি থিতাতে। খুব সূক্ষ্ম ফ্লগুলি এখানে থিতাতে বা অধঃক্ষিপ্ত হতে পারে না। (4) পরিস্রাবণ (Filtration) : থিতানো বা অধঃক্ষেপণ প্রক্রিয়াটি শেষ হলে জলকে বালি বা অ্যানথ্রাসাইটের স্তরের ভিতর দিয়ে পাঠানো হয়। ফলে জল থেকে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফ্লগুলি পৃথক হয়ে পড়ে। এই জলকে পরিস্রুত জল বলে। (5) জীবাণুমুক্তকরণ (Disinfection) : পরিস্রুত জলকে এই পর্যায়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। জীবাণুনাশক হিসাবে ক্লোরিনের ব্যবহার সর্বাধিক প্রচলিত। ক্লোরিন ছাড়া ওজোন, UV-রশ্মি, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির ব্যবহারও প্রচলিত। জলের প্রকৃতি অনুযায়ী জীবাণুনাশকগুলি পৃথকভাবে বা সবগুলি একসঙ্গেও প্রয়োগ করা হয়। 2. গৌণ শোধন প্রক্রিয়া (Secondary Treatment) : (1) মৃদুকরণ (Softening) : এই প্রক্রিয়ায় খরজল (hard water) থেকে ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন এর ক্যাটায়নগুলিকে পৃথক করা হয়। দুভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয় : (ক) জলের সঙ্গে চুন ও সোডা মেশালে Ca ও Mg আয়ন অধঃক্ষিপ্ত হয় এবং পরিস্রাবণ করে এদের পৃথক করা হয় ৷ (খ) এরপর আয়ন এক্সচেঞ্জার (ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন)-এর মধ্যে জল পাঠানো হয় । (2) কার্বন-শোষণ (Carbon absorption) : জলে উপস্থিত অবাঞ্ছিত স্বাদ ও দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক বা জৈব দূষক দূর করতে কার্বন শোষণ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়। (3) ফ্লুয়োরাইডেশন (Fluoridation) : এই পর্যায়ে জলে উপস্থিত ফ্লুরাইডের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। (4) বাতান্বয়ন (Aeration) : পানীয় জলে অল্প পরিমাণে অক্সিজেন দ্রবীভূত থাকা বাঞ্ছনীয়। সেজন্য শেষ পর্যায়ে জলের মধ্যে বুদদের আকারে বায়ু চালনা করা হয়। ফলে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ যেমন একদিকে বৃদ্ধি পায় তেমনি অন্যদিকে জলে দ্রবীভূত কার্বন ডাইঅক্সাইড ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস কিছুটা মুক্ত হয়। এইভাবে জল পানযোগ্য ও বিশুদ্ধ হলে পৌরসভা অঞ্চলে পাইপের সাহায্যে সরবরাহ করা হয়।